একটা বাঙালির ভালোবাসার ভ্রমণের কাহিনী

Bengali Traveller

ভ্রমনের কাহিনী শুনতে, বলতে এবং ঘোরার আনন্দই আলাদা। যে কোনও ভ্রমণই আমার কাছে স্মরণীয়।ছোটবেলার ভ্রমণের আনন্দ অনাবিল।সুখময়। আর প্রাপ্তমনস্ক ভ্রমণের মধ্যে থাকে অজানাকে জানা,অচেনাকে চেনার ইচ্ছা।প্রকৃতির মাঝে থাকে বহু আশ্চর্যের ঠিকানা। সেই সমস্ত আসলে বিস্ময়ের এক একটা দরজা। স্মৃতি নানা ভাবে সমৃদ্ধ করে আমাদের। স্মৃতির আলো ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়ে দেহ ও মনে। সেই আলোকরশ্মির গভীরে কথা বলে অতীত। অতীতের আকাশে ভেসে ওঠে জীবনের খণ্ড মুহূর্ত। উত্তরবঙ্গের জল হাওয়ায় আমার বেড়ে ওঠা। শিলিগুড়ির যে কোয়ার্টারে আমরা থাকতাম সেখানে থেকে দেখা যেত পাহাড়। নীল আকাশ আর পাহাড় ছিল আমার ছোটবেলার বন্ধু। এখন আবছা আবছা মনে আছে। তখন এতো নিয়ম কানুন ছিল না। তাই ভূটান বর্ডারে গিয়েছিলাম।ভালো লেগেছিল। ছুটির দিন মানে বরিবার আমরা বেড়িয়ে পড়তাম নর্থ বেঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায়। নর্থ বেঙ্গল প্রায় পুরোটাই আনন্দের সঙ্গে ঘুরেছিলাম।বেশ লেগেছিল।

ভ্রমণের কাহিনী

একটু বড় হওয়ার পরেই পাহাড় আকাশ আর সবুজের সুগন্ধ আমার থেকে ক্রমাগত দূরে সরতে থাকে। ক্লাস ফাইভ কি সিস্ক —আজ আর সঠিক মনে নেই। আমরা সকলেই কলকাতায় চলে এলাম। যে পাহাড়, নদী, আকাশ আমার খেলার সঙ্গী ছিল, হাত বাড়ালেই যাদের ছুঁতে পারতাম। তারা হারিয়ে গেলো কলকাতার ইট কাঠ পাথরের কংক্রিটে। ছোট ছিলাম। তবুও মন মানত না। মাঝে মাঝেই মনে হোত আমার পাহাড় নদী জঙ্গল আকাশ সব কোথায় গেলো? ওরাই ছিল আমার বন্ধু। একেবারে কাছের বন্ধু। বান্ধবহীন হয়ে থাকতে কারোরই ভালো লাগে না। মুক্ত আকাশের নীচে থাকলে মনে হয় আমিও মুক্ত। মুক্তির প্রশ্বাস মনের শিরা উপশিরায় প্রবেশ করে। তবে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো আমরা উত্তরবঙ্গ থেকে সরাসরি প্রপার ক্যালকাটায় আমরা আসিনি। আমরা ছিলাম মফঃস্বল অঞ্চলে। খড়দায়। সুতরাং অতোটা প্রকৃতি বিমুখও হইনি। কিন্তু তাও উত্তরবঙ্গের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অভাব বোধ করতাম। খড়দার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলাম। ছোটবেলা বলেই হয়ত মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়নি। প্রাপ্তমনস্ক অবস্থায় উত্তরবঙ্গ ছাড়লে মন খারাপ হতো বেশি। কারণ ছোটবেলা অনেক কিছু ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মনের প্রতিচ্ছবি দীর্ঘায়ু হয়। পূর্ণ বয়সের বিশ্লেষণী ক্ষমতা থাকে বেশি।

আরো পড়ুন – প্রেম কি ? প্রেমের পেছনের লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞান (The Science of Love)

কলেজ লাইফ মানে ইলেভেন টুয়েলভ পর্যন্ত সকলের মতো আমারও পড়াশোনার চাপ ছিল।বড় হওয়ার পর আমার প্রথম ভ্রমণ পুরী আর দীঘা।দুটোই বঙ্গোপসাগরের অন্তর্গত হলেও দুই সমুদ্রের ফারাক অনেকটাই।ফারাকটা হলো জলের।জলের রঙের।আমি যখন ইলেভেনে পড়ি,তখন গ্রাউন্ড চ্যানেলে ট্র্যাভেল শো করেছিলাম।ট্র্যাভেল শো করে কোনও টাকা পাইনি।আমার তখন উপার্জনের উদ্দেশ্য ছিল না।শুধুমাত্র ঘুরে বেড়ানোর জন্যই  ট্র্যাভেল শো করেছিলাম।সেই সময় বেশ কিছু জায়গা ঘুরেছি।

 উড়িষ্যা

উড়িষ্যার কথা মনে পড়ে।আরো কিছু জায়গায় গিয়েছি।বেশ ভালো লেগেছিল মূর্শিদাবাদ।গিয়েছি হাজারদুয়ারী।হাজারদুয়ারীর ঐতিহাসিক ঐতিহ্য স্মরণীয়।হাজার দুয়ার অর্থাৎ হাজার দরজা।এই প্রাসাদের অনেক দরজা।সবগুলো আসল নয়।আসলের মতো।নবাব হুমায়ুন ইউরোপীয় স্থপতি দিয়ে হাজারদুয়ারীর স্থাপত্য গড়েছিলেন।হাজারদুয়ারী রাজপ্রাসাদের কথা আজও মনে পড়ে।আর বলব জগৎ শেঠের বাড়ির কথা।জগত শেঠের বাড়ি বা তার চারপাশের জায়গাগুলি খুব ইন্টারেস্টিং।রিসেন্টলি আমি মূর্শিদাবাদ গিয়েছিলাম।আগের মূর্শিদাবাদ আর নেই।অনেক হোটেল বা অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

পুরীও আমার ভালো লাগার জায়গা।পুরীর জগন্নাথের মন্দির গিয়েছি।খুব একটা ইন্টারেস্টিং লাগেনি।প্রাচীন মন্দির হিসেবে এর অবশ্যই একটা গুরুত্ব আছে।তবে ধর্মীয় স্থানের প্রতি আমার খুব একটা উৎসাহ নেই।আমি বেনারসে গিয়েছি।বেনারসের আরতি দেখতে খুব ভালো লাগে।কাশী বিশ্বনাথের মন্দির দেখেছি।মন্দিরের শৈল্পিক কারুকার্য,স্থাপত্য আকর্ষণীয়।কিন্তু মন্দিরে প্রবেশ ও প্রস্থানের পদ্ধতি বিরক্তিকর।মন্দিরের আদব কায়দা দেখলে মানসিক ভাবে হেনস্থা হতে হয়।মন্দিরের চারপাশ এতো অপরিচ্ছন্ন;যে আমার মনে হয় ঈশ্বর এতো অপরিচ্ছন্নতার মধ্যে থাকতে পারেন না।মন্দিরের লতাপাতা,যত্রতত্র সিঁদূরের মাখামাখি দেখলে সত্যি অবাক লাগে।ঈশ্বরকে মানুষ ভালোবাসলে জায়গাটা পরিচ্ছন্ন রাখত।নিজস্ব মনস্কামনা পূরণের জন্য অন্যের অসুবিধা করার কোনও অর্থ হয় না।

ভ্রমনের কাহিনী (ওড়িষ্যার মন্দির)
ভ্রমনের কাহিনী (ওড়িষ্যার মন্দির)

বিদেশ ভ্রমন

কিছুদিন আগে টলিউডের একটা অনুষ্ঠানের জন্য সানফ্রান্সিস্কো গিয়েছি।সান ফ্রানসিস্কোর রেডউড ফরেস্টের কথা বলব।রেডউড ন্যাশনাল পার্কের সৌন্দর্য দেখলে মনে হয় এ কোনও কবির কল্পনা।আমাদের কাল্পনিক চরিত্রগুলো সত্যি হলে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করা যায় না।গাছেদের অবস্থান আমাকে ভাবিয়ে তোলে।সবুজ সবুজ আর সবুজ।চোখ মেললেই সবুজ।অরণ্যের নৈঃশব্দ,পাতার শব্দ,আমাদের কথার শব্দ— সব মিলিয়ে দৃশ্যের যে রচনা,তা ভীষণ ভাবে মনকে শান্তির সমুদ্রে নিয়ে যায়।জানা কথা,প্রতিনিয়ত আমাদের নানা সংঘাত,দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।তাই একটু মনকে পরিশুদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে।সে প্রয়োজনের জন্যই ঘুরতে যাওয়া জরুরী।যে কোনও সময়েই পরিবর্তন প্রয়োজন।জীবন ফ্রিজ শটের মতো হলে একঘেয়েমি বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে।চোখ সব সময় দৃশ্যের পরিবর্তন চায়।

আমার মাকে নিয়ে এ বছর ইজিপ্ট,ইজরাইল যাওয়ার প্ল্যান আছে।ভাবছি নেক্সট ইয়ার আমি ইউরোপ যাব।ভারতবর্ষের বৈচিত্র সম্পূর্ণ অন্যরকম।যেমন লাদাখ,অরুনাচল,কেরালা আমার পছন্দ।বিদেশের তুলনায় ভারতবর্ষ এতটা পরিচ্ছন্ন নয়।এখানে নানা রকমের অসভ্যতা আছে।তা সত্ত্বেও ভারতবর্ষই আমার প্রথম প্রেম।জানি না এমন অনুভূতি আমার কেন হয়।আমার জন্মস্থান এখানে বলেই কি এই অনুভূতি?নিজেকে আমি এই প্রশ্ন করি বারে বারে।ভারতীয়  প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে আমার নাড়ির টান।

আরো পড়ুন – পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে চিনের ৭ হাজার কেজি ওজনের অনিয়ন্ত্রিত স্পেস স্টেশন‚ যা আছড়ে পড়বে এপ্রিলের গোড়াতেই বিজ্ঞানীদের সম্ভাবনা?

ভারতবর্ষের পাহাড়ি অঞ্চলে খাবারের কথা বলতেই হয়।পাহড়ে ইয়াকের চিজ পাওয়া যায়।ইয়াকের কাচা মাংস পাহাড়ি মানুষেরা খায়।আবার তরকারি করেও খায়।শূয়োরের মাংস খায়।এছাড়া ভূট্টা দিয়ে বিভিন্ন খাবারের পদ তৈরি করে।

ভ্রমন শান্তিনিকেতন (কলকাতা থেকে)
ভ্রমন শান্তিনিকেতন (কলকাতা থেকে)

 

শান্তিনিকেতন

শান্তিনিকেতন সবাই গেছেন।এই সবাইয়ের মধ্যে আমিও পড়ি।তবে রবীন্দ্র স্মৃতি ছাড়াও শান্তিনিকেতন আমার ভালো লাগে।হয়ত আর সব রবীন্দ্রপ্রেমীর তুলনায় আমার অনুভূতি কম।শান্তিনিকেতনের একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে।তবে যে শান্তিনিকেতনের কথা আমরা বইয়ে পড়েছি সে শান্তিনিকেতন এখন আর নেই।আসলে সব কিছুর সঙ্গে ব্যবসা জড়িয়ে পড়লে সৌন্দর্য বিঘ্নিত হয়।শান্তিনিকেতন থেকে বেরিয়ে শ্রীনিকেতন,কোপাইয়ে গিয়েছি। সেখানেও ব্যবসায়িক গন্ধ।তবুও কিছু শান্তি আছে;শান্তিনিকেতনে।

কলকাতাকেও আমার ভ্রমণের তালিকা থেকে বাদ দেবো না।শীতের কলকাতার একটা আলাদা চরিত্র আছে।আমার ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ কলকাতার পুরানো কিছু বাড়ি,কলেজস্ট্রীট,কফিহাউস।আমি যাই সেখানে।যেতেও খুব ভালো লাগে।নর্থ ক্যালকাটার জগন্নাথ ঘাট আমার অত্যন্ত প্রিয়।কিন্তু এই জায়গাটাও অপরিচ্ছন্ন।জগন্নাথ ঘাট কলকাতার পাঁচটা জায়গার মধ্যে অন্যতম।আমাদের দুর্ভাগ্য জায়গাটাকে আমরা সুন্দর রাখতে পারিনি।রাখলে টুরিজমের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠত।ভবিষ্যতে আরো ভ্রমণের ইচ্ছে আছে।সত্যি বলতে কি,আমার জীবন জুড়েই থাকবে ভ্রমণ।আর থাকবে ভ্রমণের আনন্দ।

 

বাকিদের সাথে শেয়ার করুন
  • 41
    Shares
  • 41
    Shares

Leave a Reply